আরজ আলী মাতুব্বর: আত্মবিশ্বাসী প্রশ্ন নাকি প্রজ্ঞার চূড়ান্ত সীমা?



আরজ আলী মাতুব্বরকে অনেকে জ্ঞানপিপাসু, দার্শনিক, যুক্তিবাদী—বিভিন্ন বিশেষণে অভিহিত করেছেন। তবে, বর্তমান যুগের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে, তাঁর তর্ক, প্রশ্ন এবং দর্শন সবসময় প্রজ্ঞার নিদর্শন নয়। বরং, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো সীমিত জ্ঞান থেকে উঠে আসা আত্মবিশ্বাসী সংশয় হিসেবে দেখা যায়।

স্বশিক্ষার সীমাবদ্ধতা

স্বশিক্ষিত হওয়া মানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্ঞানী হয়ে যাওয়া নয়। শিক্ষকবিহীন ও গুরুহীন চিন্তা, কখনো কখনো মানুষকে এমন এক আত্মতুষ্ট অবস্থানে নিয়ে যায়, যেখানে সে নিজেকেই সত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড মনে করতে শুরু করে। মাতুব্বরের লেখনিতে এই প্রবণতার ছাপ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

সীমিত মানববুদ্ধি নিয়ে সমগ্র মহাবিশ্বের মালিক সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দেওয়া প্রজ্ঞার পরিচায়ক নয়। কোরআনের বহু সত্য এবং অদৃশ্য বাস্তবতা মানুষের পরীক্ষাগারে যাচাইয়ের বিষয় নয়। সবকিছুকে মাইক্রোস্কোপ বা ল্যাবরেটরি নিয়মে মাপার ধারণা মূলত সংকীর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি।

ইসলাম: জীবন যাপন অপারেটিং সিস্টেম

মাতুব্বর কোরআনকে কখনোই চূড়ান্ত জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করেননি; তিনি ইসলামকে অন্য ধর্মের মতো একটি ‘পদ্ধতি’ মনে করতেন। বাস্তবে ইসলাম হলো মানবজীবনের সম্পূর্ণ নীতিমালা, যা কোরআন মাজীদে সংহতভাবে দেওয়া আছে।

আপনি চাইলে এটিকে একটি সফটওয়্যার অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে ভাবতে পারেন—কোরআন হলো সেই কোড, যা মানবজীবনের সমস্ত দিক পরিচালনা করে। প্রথম মানবজাতির জন্য আল্লাহ এই ‘সফটওয়্যার’ যুগে যুগে আপডেট করেছেন, সর্বশেষ ও নিখুঁত ভার্সন প্রদান করেছেন প্রিয়তম প্রেরিত প্রোগ্রামার হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মাধ্যমে।

যিনি সেই সময়ের সবচেয়ে অজ্ঞ এবং বর্বর সমাজের ওপর এই অপারেটিং সিস্টেম ইন্সটল করেছিলেন, তাদের জীবনমান, আচরণ এবং মানবিক গুণাবলির উন্নয়নে অনন্য রূপান্তর ঘটেছে। এটি প্রমাণ করে—সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কোডিং ব্যবহার করলেই জ্ঞানের বিকাশ সম্ভব।

যুক্তি বনাম আত্মপ্রবঞ্চনা

যে ব্যক্তি নিজের যুক্তিকেই সর্বোচ্চ মানদণ্ড ধরে, কেবল চিরপ্রতিষ্ঠিত সত্যের দিকে আঙুল তোলেন, তার প্রশ্ন সবসময় প্রজ্ঞার পরিচায়ক হয় না। অনেক সময় তা মূর্খতার পরিশীলিত রূপ হয়ে দাঁড়ায়। লেখনীর জোরে প্রচার করা যায়—কিন্তু সত্য বদলানো যায় না।

মানুষ সাধারণত সেই বিষয়ে যুক্তি দেখাতে বেশি আগ্রহী, যা তাকে জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করবে। যেমন—ধূমপায়ীরা জানে ধূমপান ক্ষতিকর, তবু অভ্যাসের কারণে চালিয়ে যায়। ঠিক তেমনি, অনেকেই গল্প, প্রেম, বিতর্ক, বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা—এসব নিয়ে বেশি সময় দেয়; কিন্তু কোরআন পড়া, হাদিস বোঝা, নামাজে অভ্যস্ত হওয়া এবং অন্যকে সত্যের পথে আহ্বান করা—এগুলো এড়িয়ে যায়।

ফলে, কেউ যদি নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে চলে, ভোগকেন্দ্রিক জীবনকে বৈধ মনে করে, তারা এমন প্রশ্ন ও দর্শনকে গ্রহণ করে যা তাদের প্রবৃত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এজন্যই মাতুব্বরের লেখা কিছু মানুষের কাছে প্রিয় হলেও তা সত্য অনুসন্ধানের জন্য নয়, বরং জীবনযাপনের মানসিক সান্ত্বনা দেয়।

চিরকল্যাণকর জীবনবিধান

কোরআন মানবজাতির জন্য চিরকল্যাণকর জীবনবিধান। এটি কেবল ধর্মগ্রন্থ নয়; এটি মানুষকে তার স্রষ্টা, দায়িত্ব, নৈতিকতা, পরিণতি এবং মুক্তির পথ স্মরণ করিয়ে দেয়।

কোরআনের সামনে বিনয়ী হয়ে দাঁড়ানোর বদলে কেউ যদি নিজের সীমিত বুদ্ধিকে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়ে বিচারক বানায়, তবে তা জ্ঞান নয়, জ্ঞান-অভিমান। প্রশ্ন করা দোষ নয়; কিন্তু যে প্রশ্ন সত্য জানার জন্য নয়, বরং সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য করা হয়—সেটি জ্ঞানচর্চা নয়, আত্মপ্রবঞ্চনা।   

    @ইবনে মোহাম্মাদ




Comments