সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও আমাদের পরিচয়


   আমরা কোন পথে?

আজকের তরুণ সমাজ যে সংস্কৃতির জোয়ারে ভাসছে, তার গভীরে কি আমাদের নিজস্ব বিশ্বাস বা ঈমানি চেতনা আছে? নাকি আমরা অবচেতনভাবে এমন কিছু প্রথাকে আপন করে নিচ্ছি যা আমাদের মূল পরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক? শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা মোড়কে ইদানীং এমন কিছু বিষয় ঢুকে পড়েছে যা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

চলুন দেখে নিই, ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র নামে প্রচলিত এমন কিছু বিষয় যা আসলে বিজাতীয় বা ধর্মীয় চেতনার পরিপন্থী হতে পারে:

১. মঙ্গলপ্রদীপ: আলো নাকি আশীর্বাদ প্রার্থনা?

যেকোনো অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রদীপ জ্বালানোকে এখন আধুনিকতা ভাবা হয়। কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য ছিল অগ্নিদেবতার আশীর্বাদ কামনা করা। মুসলিম প্রধান দেশে কুরআন তিলাওয়াতের পরিবর্তে এই রীতি পালন কি আমাদের নিজস্ব পরিচয়কে ঝাপসা করে দিচ্ছে না?

২. মঙ্গল শোভাযাত্রা ও মুখোশ সংস্কৃতি

১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত মূর্তিও বাদ্যযন্ত্রগুলো মূলত নির্দিষ্ট একটি ধর্মের পূজার অনুষঙ্গ। প্রশ্ন হলো, নিরাপত্তা বা মঙ্গলের মালিক কে? একজন মুমিনের জন্য আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে ‘মঙ্গল’ প্রার্থনা করার সুযোগ নেই।

৩. বসন্ত উৎসব ও চৈত্রসংক্রান্তি

প্রকৃতিকে বরণ করার নামে বর্তমানে যা হচ্ছে, তার অনেক কিছুই প্রকৃতি পূজার নামান্তর। আবির খেলা বা দোলযাত্রার মতো ধর্মীয় রীতিগুলো যখন ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র লেবাসে মুসলিম তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমাদের ধর্মীয় স্বকীয়তা হুমকির মুখে পড়ে।

৪. শিখা অনির্বাণ ও শিখা চিরন্তন

অগ্নিকে শ্রদ্ধা জানানো বা এর সামনে দাঁড়িয়ে শপথ করা অগ্নি উপাসকদের রীতি। ইসলামে আগুনের শিখাকে সম্মান দেখানোর কোনো স্থান নেই। এমনকি সাহাবীগণ কেবল সালাতের সময় ঘোষণার জন্য আগুন ব্যবহারের প্রস্তাবও নাকচ করে দিয়েছিলেন কারণ এটি অন্য ধর্মের নিদর্শন।

৫. শহীদ মিনার ও আলপনা

ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। কিন্তু শহীদ মিনারের বেদীমূলকে ‘পবিত্র’ মনে করে খালি পায়ে যাওয়া, সেখানে আলপনা আঁকা (যা মূলত লক্ষ্মীপূজার অনুষঙ্গ) কিংবা জিরো আওয়ারে নির্দিষ্ট স্তব করা—এসবের সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। শহীদদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করা।

৬. কপালে টিপ ও রাখিবন্ধন

সৌন্দর্যের দোহাই দিয়ে মুসলিম নারীরা কপালে টিপ ব্যবহার করছেন, যা আসলে প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতির অংশ। তেমনি ‘রাখিবন্ধন’ও একটি ধর্মীয় আচার। না জেনে এসব অনুকরণ করা আমাদের হীনম্মন্যতারই বহিঃপ্রকাশ।

৭. ভাস্কর্য ও প্রতিকৃতি

শ্রদ্ধার আতিশয্যে বরণীয় ব্যক্তিদের মূর্তি বা ভাস্কর্য নির্মাণ এবং সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা মূর্তিপূজার নামান্তর। মূর্তিপূজার সূচনাও হয়েছিল মৃত ব্যক্তির প্রতি অতি-ভক্তি দেখাতে গিয়েই।

৮. নাম ও সম্বোধনে পরিবর্তন

বাঙালিত্ব জাহির করতে গিয়ে ইদানীং সন্তানদের এমন সব নাম রাখা হচ্ছে যা মুসলিম ঐতিহ্যের সাথে মিলে না। এমনকি অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নামও দেব-দেবীর নামে রাখা হচ্ছে, যা একজন সচেতন মুসলমানের পরিহার করা উচিত।

৯. মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ভুল পদ্ধতি

কফিনে ফুল দেওয়া বা নীরবতা পালন করা—এগুলো বিজাতীয় কালচার। ইসলামের বিধান হলো মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা এবং তাকে দ্রুত দাফন করা। নীরবতা পালন মৃত ব্যক্তির কোনো উপকারে আসে না।


ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, মুমিনদের পথ ছেড়ে অন্য পথ অনুসরণ করলে তার পরিণাম ভয়াবহ (সূরা নিসা: ১১৫)। রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন, *"যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।"* (আবু দাউদ)।


তাই আধুনিকতার নামে অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং নিজস্ব ঈমানি চেতনা ও সঠিক জ্ঞান নিয়ে আমাদের পথ চলতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি হোক 

আমাদের বিশ্বাসের প্রতিফলন।


শেয়ার করে বন্ধুদের জানিয়ে দিন!

Comments