যিলহজ্ব মাসের তিনটি নিয়ামত

 


লেখিকার কথা।


২০০১ সালে আব্বা আম্মা হজ্বে যান। দেড় মাস পরে আম্মা ফিরে আসেন আমার আব্বা আর এলেন না। তার মা'বুদের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান বিদায়ী তওয়াফের আগে মীনায়। রাত প্রায় ২টার দিকে আব্বা ইন্তেকাল করেন। আমার আম্মা বলেছেন মৃত্যুর দিন বিকেলে আব্বা তার পরিচিত এক ব্যক্তিকে (যিনি হজ্ব করতে এসেছেন এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাসী) বলছেন। "তোমার বাস্তব জীবনের কর্মকা- আর তোমার তালবিয়া পাঠের মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই।"
ভদ্রলোক বুঝতে না পেরে বলেছেন, 'তার মানে?'
"তুমি তালবিয়া বলছ 'লা শারি কা-লাকা লাব্বাইক'। হে প্রভু আমি হাজির হয়েছি- তোমার কোনো শরীক নেই। ঘোষণা দিচ্ছ আল্লাহর কোনো শরীক নেই। অথচ আইন প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছ গাইরুল্লাহর।" এইভাবে অনেকক্ষণ তর্ক করার পর আম্মা আব্বাকে বলছেন "হজ্ব করতে এসে কেন রাজনীতি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছেন? যার যার হজ্ব সে সে করেন তো।"
আব্বা অবাক হয়ে বলেছেন, "রুমীর মা এসব তুমি কি বলছ? (আমার আব্বা আমার আম্মাকে রুমীর মা বলে ডাকতেন) এই লোক আমার বন্ধু লোক। দুই লক্ষ টাকা খরচ করে হজ্বে এসেছে। খুব ভালো লোক শুধু জানে না বলেই র্শিকি চিন্তা-চেনতার মধ্যে ডুবে আছে। ওকে বুঝানো তো আমার নৈতিক দায়িত্ব।"
মাগরিবের পরে ঐ ভদ্রলোককে আব্বা আবার বুঝাতে লাগলেন। এক পর্যায়ে সেই ভদ্রলোক বলেছেন, "এই আল্লাহর ঘরে এসে বলছি, দেশে ফিরে যেয়ে আর ঐ সব রাজনীতির সাথে সম্পর্ক রাখব না। আল্লাহর পথে র্শিক করা হয় এ ধরনের কোনো কাজ করব না।"
আমার আব্বা তখন অসম্ভব খুশি হয়েছিলেন। আমার আম্মা এখনও সেই সব কথা বলেন আর কাঁদেন। হজ্বে যাওয়ার আগে তালবিয়ার তাৎপর্য সম্পর্কে আমাকেও এসব কথা একাধিক বার বলেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর মনে হলো এই সব কথা সবাইকে জানানো উচিত। তা না হলে বাবার হক আদায় হবে না। তাই হজ্ব সংক্রান্ত বইগুলো গভীর মনোনিবেশ পড়তে লাগলাম। এই ক্ষুদ্র পুস্তিকাখানি লিখেছিলাম আব্বার মৃত্যুর পর পরই। নিজের তো হজ্ব করার সৌভাগ্য হয়নি তাই বইখানি প্রকাশ করতে ইতস্তত বোধ করছিলাম। আল্লাহপাক কবে আমার জীবনের এই একমাত্র ইচ্ছেটি পূরণ করবেন জানি না। সময় তো বসে থাকে না। কখন পরপারের ডাক এসে যাবে তাও তো জানি না।
প্রকাশক আব্দুল কুদ্দুস সাদী সাহেব পা-ুলিপিটি পড়ে প্রকাশ করার খুব আগ্রহ করতে লাগলেন। তার আগ্রহেই রাজি হয়ে গেলাম। আল্লাহ পাক যেনো এই ক্ষুদ্র পুস্তিকা খানির ভুল-ত্রুটি মার্জনা করে সওয়াবটুকু আমার আম্মা, প্রিয়তম আব্বা এবং কবরবাসী সকল আত্মীয় অনাত্মিয়দের প্রতি পৌঁছে দেন। আর আমাকে যেনো হজ্ব করার তৌফিক দান করেন।  আমীন॥
অনভিজ্ঞ এই লেখিকার লেখার মধ্যে বিজ্ঞ পাঠকেরা যদি কোনো ত্রুটি দেখতে পান- আর আমার ভুলগুলো দেখিয়ে দেন তো আমি চির কৃতজ্ঞ থাকব।
বিনীতা

মাসুদা সুলতানা রুমী।

-----------------------------------------------------


যিলহজ্ব মাসের তিনটি নিয়ামত!

আরবি বছরের শেষ মাস যিলহজ্ব মাস। বর্ষপরিক্রমায় প্রতি বছরই ঘুরে ঘুরে আমাদের জীবনে আসে নিয়ামত ও ফযিলত পরিপূর্ণ এই মাস। যিলহজ্ব মাস কুরবানীর মাস, যিলহজ্ব মাস দ্বিতীয় ঈদের মাস। যিলহজ্ব মাস মুবারকময়, ফজিলতময়, নিয়ামতে পরিপূর্ণ একটি মাস। এই মাসটি মুমিন জিন্দেগীতে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। এই মাসের প্রথম ৯ দিন নফল রোজার দিন। বিশেষ করে ৯ তারিখ। এই দিনটিকে বলে আরাফাহ দিবস। এই দিনটি ক্ষমা ও মুক্তির দিন। 

হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন "আরাফার দিন আল্লাহ পাক এত অধিক সংখ্যক লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন যা আর কোনদিন দেন না। সেদিন তিনি বান্দার অতি নিকটবর্তী হয়ে যান এবং ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করতে থাকেন। (সহীহ মুসলিম)

এই দিনের রোজা সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, "এ দিনে রোজা রাখলে পিছনের এক বছর এবং সামনের এক বছরের গুণাহ মাফ হয়ে যায়।" তবে এদিনে হজ্ব পালনকারী হাজীগণ রোজা রাখবে না।

এই মাসের ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ তারিখে হজ্ব সম্পন্ন হয়। সারাবিশ্বের মুসলমানদের অন্তরে এই সময়ে আল্লাহ প্রেমের সাড়া পড়ে যায়। এই পবিত্র ইচ্ছা নিয়ে যখন সে হজ্বের সফরে যাবার জন্য তৈরি হয় তখন তার স্বভাব-প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। তার অন্তরে বাস্তবিকই আল্লাহ প্রেমের উদ্দীপনা স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে। তার মনে তখন নেক ও পবিত্র ভাবধারা ছাড়া অন্য কিছুই জাগতে পারেনা। সে পূর্বে করা গুনাহ থেকে তওবা করে। সকলের কাছে ভুল-ত্রুটির ক্ষমা চায়, পরের হক যা নষ্ট করেছে তা আদায় করে। আসল কথা হল এটি একটি বিশাল সংশোধনকারী কোর্স।

চলবে ইনশাআল্লাহ!

Comments