- Get link
- X
- Other Apps
- Get link
- X
- Other Apps
আমার দাদী জোবায়দা বেগম অসম্ভব সুন্দর সুন্দর গল্প বলতেন । আর বলতেন প্রবাদ বাক্য।
একদিন তিনি বললেন
"আমি কি আমি ?
না আমি হইলাম ঐ
আমি যদি আমি হই-
তো আমার কদু গেল কই?"
কোন প্রসঙ্গে কেন বলেছিলেন, তা মনে নেই। কিন্তু কবিতার মত কথাটায় খুব মজা লাগল। দাদীকে
চেপে ধরলাম , "বুজি এর মানে কি?" দাদীকে আমরা বুজি বলে ডাকতাম। বুজি তখন
গল্পটা বললেন।
" এক বাড়ির মুসাফির খানায় দুই ব্যক্তি এসে আশ্রয় নিল। বাড়ির মালিক দু'জনকেই খানা,
পিনা এবং শোয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে বাড়ির মধ্যে চলে গেলেন। এই দুই মুসাফিরের একজনের
কাছে একটা কদু
(লাউ) ছিল। লাউটা কোলের কাছে নিয়ে সে ঘুমিয়ে গেল। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে লাউ তার
কাছে নেই। অপর মুসাফির লাউটা কোলের মধ্যে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। যার লাউ সে
বলল " ভাই কদুটা
তো আমার , তুমি নিছো ক্যান?
দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, " না এ কদু আমার । আমার কদু আমার কাছেই আছে।" বাক বিতন্ডা
শুনে বাড়ির মালিক বললেন " কি ব্যাপার কি হয়েছে তোমাদের ? তখন যার লাউ সে বলল,
" ভাই বুঝতে পারতেছি না,
আমারে একটু বুঝায়ে দেন তো।"
মালিক বললেন , "কি বুঝাবো?" সেই ব্যক্তি বলল-
" ভাইরে , আমি কি আমি?
না আমি হইলাম ঐ-
আমি যদি আমি হই
তো আমার কদু গেল কই?
গল্পটা শুনে হাসতে হাসতে পেটে ব্যাথা হয়ে গিয়েছিল। তারপর যখনই গল্পটা মনে হতো তখনই
হাসতাম। কিন্তু এখন আর গল্পটা মনে হলে হাসি পায় না। বরং অসহায় সহজ সরল এক ব্যক্তির
চেহারা ভেসে ওঠে
চোখের সামনে । যাকে বোকা ও বলা যায় । যে চোরের হাত থেকে নিজের জিনিস তো রক্ষা করতে
পারেই না বরং চোরের গলাবাজিতে নিজেই চোরের মতো হয়ে যায়।
ঠিক তেমনি আজকে আমার অবস্থা।
আমাদের বাড়িটা তখন ছিলো মুক্তি যোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল। রাতের ঠিকানা। আর আজ আমরা মুক্তি
যুদ্ধের চেতনা ধারীদের ভয়ে সন্ত্রস্থ। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করলে যদি মুক্তি যোদ্ধা
হওয়া যায় তাহলে আমি , আমার মা , আমরা তো মুক্তিযোদ্ধা।
১৯৭১ সাল। মোবাইল ফোন কাকে বলে তা তো দুনিয়া চিনতই না। ঘরে ঘরে ল্যান্ড ফোন ও
ছিলো না্।
আমার আব্বা মোহাম্মাদ ফকরুল ইসলাম মোল্লা ই.পি.আর এর হাবিলদার। এখন মুক্তিযোদ্ধা, কোথায়
থাকেন জানি না। মাঝে মাঝে অনেক রাতে বাড়ি আসেন। সাথে হিন্দু মুসলমান অনেকেই । আমার
ঘুম ভেঙ্গে যায়। উঠে দেখি মা রান্না ঘরে। এদের সবাই কে খাওয়াবেন রান্নায় ব্যস্ত। মাকে
টুকটাক সাহায্য করি। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটত।
১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। নতুন করে স্কুলে যাওয়া শুরু করি। স্কুল ড্রেস পরে, সদ্য
স্বাধীন হওয়া দেশে , মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে। দুই পাশে চুলের বেনী দুলিয়ে যখন হেটে
যেতাম তখন কেমন যেন একটা অহংকার, একটা গর্বে বুক ভরে উঠত।
দেশের প্রতি ভালবাসায় হৃদয় আপ্লুত হয়ে যেতো।
২৬শে মার্চে বিচিত্রানুষ্ঠানে
"মুজিব বাইয়া যাওরে----
নির্যাতিত দেশের মাঝে , জনগনের নাওরে মুজিব
বাইয়া যাওরে--------।
-------------- তুমি বাংলার চির সম্রাট
অন্ধকারের শশীরে মুজিব-------।
গাইতে গাইতে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললাম।
চর্তুদিক থেকে হাত তালিতে মুখরিত হয়ে গেল হলরুম। এই তো সেই আমি। মাসুদা সুলতানা রুমী।
স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় একটা S.S.C পরীক্ষা হয়েছিল পাকিস্থান সরকারের
অধীনে। তখন নাকি অনেক ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দিয়েছিল। তাদের ধিক্কার দিয়েছি হৃদয়ের সমস্ত
ঘৃনা দিয়ে। শেখ মুজিবের প্রতি ভালবাসা ছিলো আকাশ ছোঁয়া। বঙ্গবন্ধ , জাতির পিতা কিংবা
শেখ সাহেব না বলে 'মুজিবর' কেন বলল? এই অপরাধে কাজের বুয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলাম।
ছোট বেলা থেকেই মাকে আম্মা বলে ডাকতাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে আম্মাকে মা
বলতে লাগলাম। আম্মা উর্দ্দূ শব্দ তাই। প্রথম প্রথম লজ্জা লাগতো, তারপর ঠিক হয়ে গেল।
মনে হতো দেশের জন্য, ভাষার জন্য আমি জীবন দিয়ে দিতে পারি।
আমাদের বাড়ির দক্ষিন দিকে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ । শীতের দিনে সরষে-মটরশটি ক্ষেতের
দিকে তাকিয়ে অভিভূত হয়ে যেতাম! নিজের অজান্তেই গেয়ে উঠতাম
" এমন দেশটি কোথাও খুজেঁ পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি।"
চৈত্র বৈশাখ মাসে ধান ক্ষেতে বাতাসে নাচন দেখলে কন্ঠে উঠে আসতো " এমন ধানের ওপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে।"
সেই শিশু কাল থেকে দেশের জন্য মনের গভীরে কি যে টান ! কি যে ভালবাসা!।
যুদ্ধ শুরু:- যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন আমরা যশোর ছিলাম । এক রাতে চিৎকার চেঁচামেচি তে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বারান্দায় এসে দেখি , পূর্ব দিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।
ওখান কিসের যেন একটা কারখানা ছিল । বড়দের কথাবার্তায় বুঝলাম বিহারীরা কারখানায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। রাতটা আল্লাহ আল্লাহ করে পার করে দিয়ে সকাল বেলা তাড়াহুড়া করে
আব্বা আমাদের আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে এলেন। যশোর সষ্টি তলায় নমিতা মনজিল নামে একটা বাড়ি ছিল, ইংরেজ আমলে কোন হিন্দু জমিদারের বাড়ি। পরর্বতীতে সেই বাড়ি ছিল
ই.পি. আর এর হাসপাতাল। এই হাসপাতালের দোতালায় আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়ে ছিল। এখানে দুই তিন দিন ছিলাম আমরা।তারপর গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে একেবারে খালি হাতে বের হয়ে
পড়ি। আমার দাদাও আমাদের সাথে ছিলেন। তিনি কয়েকদিন আগেই এসেছেন , আমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে। তখন আমরা চার ভাই বোন। আমর বয়স এগার বছর আর সবার ছোটটির
বয়স এগারো মাস। মাঝখানে দুই জন। ভাইটির বয়স সাত বছর, আর একটি বোন বয়স তিন বছর। আসতে আসতে আব্বা বললেন
"একট ভুল হয়ে গেল রুমীর মা।"
"কি ভুল?" সবাই তাকালাম আব্বার দিকে । আব্বা বললেন সাইকেলটা যদি নিয়ে আসতাম তাহলে দুইজনকে সাইকেলে বসায়ে নিয়ে যেতে পারতাম। আসলে আমার সাত বছর বয়সী ভাইটির
এতটা পথ হাটতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। তিন বছর বয়সী বোনটি আব্বার কোলে আর ছোট বোনটি আম্মার কোলে। এই ভাবে বেশকিছু দূর চলার পর আব্বা একটা ট্রাক দাড় করালেন। আমাদের টেনে
তুললেন ট্রাকে । বরদিয়া নামক একটা জায়গায় ট্রাক আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেল। আব্বা আম্মা ট্রাক ওয়ালাদের অনেক দোয়া করলেন। ভাড়া দিতে চাইলেন কিন্তু তারা কিছুতেই নিলেন না।
বরদিয়া এসে মনে পড়লো আমাদের কাছে কোন টাকা পয়সা নেই। যা ছিলো তা সব ভুলে ফেলে এসেছি যশোরে। আমার একটা মাটির ব্যাংক ছিলো আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষন আগে
সেটা ভেঙ্গে একটা রুমালে পয়সা গুলো গুলো বাধলেন। গুনে দেখার সময় হয়নি। সেই পয়সা গুলো রেখে এসেছি। পয়সা গুলোর জন্য কি যে কষ্ট পেলাম। আব্বার আংগুলে একটা আংটি ছিলো।
আমার নানু এই আংটিটা তার জামাই কে দিয়েছিলেন। আংটিটা আমার আম্মার কাছেই থাকতো। আব্বা আংটিটা আম্মার কাছে থেকে চেয়ে নিলেন। তারপর একটা বড় দোকানের সামনে যেয়ে দাড়ালেন।
আমরা সবাই তার পিছনে। শেষ বিকেল । ক্ষুধায় আর হাটতে পারছি না।
আব্বা পকেট থেকে আংটিটা বের করে বললেন " ভাই এই আংটিটা কিনবেন?" দোকানদার আব্বার হাত থেকে আংটিটা নিয়ে ঘোরায়ে ফিরায়ে দেখলো, তারপর বলল " দশ টাকায় দেবেন?"
আব্বা চুপ করে থাকলো। ঐ দোকানদার আংটিটা আব্বার হাতে দিতে দিতে বলল "পনের টাকায় দিলে দেন, নইলে অন্য কোথাও দেখেন।" সোনার দাম তখন অনেক কম কিন্তু আংটিটাতে যে
পরিমান সোনা আছে তাতে ওটার দাম ৪০/৫০ টাকা হবে। আব্বা চুপ করে দাড়ায়ে থাকলেন। মনে হয় লোকটা বিশ টাকা বললেই আব্বা আংটি দিয়ে দেবেন। এমন সময় ছোট্ট একটা ছেলে আব্বাকে
বলল " এই যে চাচা ঐ দোকানদার আপনারে ডাক পারে।" চলবে----
এই দোকানের ওপর পাশেই একটা মিষ্টির দোকান , ছেলেটি ঐ দোকান দেখায়ে দিল। আমরা সবাই মিষ্টির দোকনের সামনে গেলাম। দোকানদার আব্বাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বলল "ভাই বাচ্চারা আগে কিছু খেয়ে নিক। আপনি কিছু খান, চাচা তো খুবই দুর্বল হয়ে গেছে। আহারে সারাদিন মনে হয় কিছু খাওয়া হয় নাই"। বলে সবাই কে মিষ্টি আর পুরি খেতে দিলেন। ততক্ষনে চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। দোকানে দোকানে মোমবাতি , হ্যারিকেন জ্বালানো হয়েছে।
আব্বা আম্মা ও খেলেন। খাওয়া শেষে আব্বা দোকানদার কে বললেন "ভাই আপনার বিল কত হল? আমার আংটিটা-----।" ভদ্রলোক আব্বাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন "ভাই এখন এসব কথা থাক, আর আংটি ও আপনার কাছে থাক, রাত হয়ে গেছে এখনতো আর কোথাও যেতে পারবেন না। কাল সকালে দেখা যাবে।" বলে ভদ্রলোক তার দোকান সংলগ্ন একটা ঘরে থাকতে দিলেন। আমরা শোয়ার জায়গা পাওয়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে গেলাম। রাত দশটার সময় আমাদের ডেকে তুলে ভাত খাওয়ালেন। সকালে নাস্তা খাওয়ালেন।
আব্বা আংটিটা বের করে বললেন " ভাই আপনার মিষ্টি, পুরি, ভাতের দাম নিয়ে আমি যা পাই আমাকে দেন। রাতে থাকার জায়গা দিয়ে আপনি যে উপকার করেছেন, এ ঋন আমি কোন দিন শোধ করতে পারবো না।"
আব্বার হাত ধরে ভদ্রলোক বললেন " ভাই আংটিটা আপনার কাছেই থাক। আমি না হয় একবেলা আপনাদের মেহমানদারীই করলাম"। বলে জোর করে আব্বার হাতে পাঁচটা টাকা গুজে দিলেন। আব্বা কিছুতেই টাকা নেবেন না। ভদ্রলোক অনুরোধ করে বলতে লাগলেন " ভাই মনে করেন এই টাকা আমি আপনাকে ধার দিলাম। যদি দেশ স্বাধীন হয় আর আপনার সাথে আমার দেখা হয়, তাহলে আমারে এই টাকা ফেরৎ দিয়েন। এই পাঁচ টাকায় আপনি বাড়ি পর্যন্ত পৌছে যেতে পারবেন"।
বরদিয়া থেকে লঞ্চে এসে নামলাম টেকেরহাট। এখান থেকে তিন মাইল দূরে রাজৈর থানার 'আলম দস্তার' আমাদের গ্রামের বাড়ি। যশোর থেকে এই দীর্ঘ সফরে পথে পথে অনেকের সহোযোগিতা ও সহমর্মীতা পেয়েছি। ১৯৭১ সালের ২৯ শে মার্চ আমরা গ্রামের বাড়িতে পৌছাই। বাড়িতে পৌছেঁ ভাবলাম বেঁচে গেলাম।আর কোন সমস্যা নেই।
আমাদের গ্রামটা গ্রাম হলেও যোগাযোগ বা যাতায়াত ব্যবস্থা খুব ভাল। বিখ্যাত বরিশাল রোড আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে গেছে। আর যথাযথ কারনেই পাকিস্থানী আর্মীর গাড়ী আসতে দেরী হলো না। এপ্রিলের ১০/১৫ দিন যেতে না যেতেই পাকিস্থানের আর্মী বাহিনী ঢুকে পড়ল আমাদের গ্রামে। গ্রামের লোকেরা দিশেহারা হয়ে পালাতে লাগলো যার যার পরিবার পরিজন নিয়ে। আমার দাদা দাদী বাড়িতে থাকলেন। আব্বা আম্মা আমাদের নিয়ে চলে আসলেন মকসুদপুর থানার নওহাটা গ্রামের বড় বাড়িতে। আমার নানা বাড়ি। এই বাড়িতে ৬০ এর অধিক পরিবারের বসবাস। আর এই জন্য বাড়িটার নাম বড়বাড়ি। এই বাড়ির অধিকাংশ মানুষই হয় আর্মী না হয় পুলিশ ডিপার্টমেন্টে চাকুরী করেন। আমার নানা এ.এস.পি ছিলেন। এ বাড়ির সবাই চাকুরীজীবি। তাই অন্যসময় তেমন একটা লোকজন থাকে না।কিন্তু এখন সবাই যার যার চাকুরীস্থল থেকে বাড়ি চলে এসেছে। বাড়ি ভর্তি মানুষ। বড়রা দুশ্চিতায় থাকলেও আমরা খুব আনন্দে ছিলাম।
এখানে বেশ কিছু দিন থাকার পর আমরা আবার আমাদের
দাদা বাড়ি চলে আসলাম। নওহাটা গ্রামটা একদম বিলের মধ্যে। যানবাহন বলতে একমাত্র
নৌকা। ১৯৭১ সালে বর্ষাকলে বাড়ির উঠানে এক মাজা পানি। ঘর ছুই ছু্ই করছে। আর্মীরা কোনদিন
এদিকে আসেনি। তবে আমার দাদা বাড়ির অবস্থান বাড়ির অবস্থা একদম ভিন্ন। এখানে পুরাপুরি
পাকিস্থান। টেকের হাটে বিরাট আর্মী ক্যাম্প। দিনে মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামে ঢুকতেই
পারতো না।
পরে বুঝলাম আমাদের বাড়িতে আসার এই কারণ।
প্রতি রাতেই মুক্তিযোদ্ধারা আসতেন আমাদের বাড়িতে , খাওয়া দাওয়া করে আবার রাতেই চলে
যেতেন আব্বা সহ। আমার খুব ইচ্ছে হতো তাদের সাথে যেতে । নভেম্বর , ডিসেম্বরের সেই দিন
গুলো। কি যে ভয়ংকর ছিল । মুকিযোদ্ধারা অনেকেই ঢুকে পরেছে গ্রামে। স্থানীয় রাজাকাররা
তখন সন্ত্রস্ত। রাজাকার সাত্তার মোল্লা পরিবার নিয়ে টেকের হাট ক্যাম্পে যেয়ে উঠল নিরাপত্তার
জন্য।
আমাদের জমি যে বর্গাচাষ করতো সে ও রাজাকার হয়েছিল। সে বছর সে আমাদের একটা ধান
ও দেয় নাই। আমার দাদা ধানের কথা বলতে গেলে সে বলল " চাচা ধান চোরে লইয়া গেছে।
আমি চাকরি নিয়া ব্যস্ত ঠিকমতো দেখা শোনা করতে পারি নাই"। আমার বৃদ্ধ দাদা আর কথা
বলেন নি ধীরে ধীরে বাড়ি এসে চুপ করে বসে ছিলেন।
আমাদের বাড়ির চারপাশে অনেক কলা গাছ ছিল। আমার দাদাই লাগিয়েছেন সব। এক সাথে দুই কাঁদি
কলা পেকেছে। এক কাদিঁ খুব বড় আর কলা দেখতে ও খুব সুন্দর, আর এক কাঁদি ছোট।
কয়েক দিন থেকে আব্বার কোন খোঁজ খবর নাই। তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিল না কারো। আমার
আম্মা দাদাকে আস্তে আস্তে বললেন " আব্বা একটা কথা বলি?" দাদা আম্মার দিকে
তাকালেন। আম্মা বললেন " দুই ছড়ি কলা পাকছে। এক ছড়ি কলা বাজারে নিয়ে যান না-------
কিছু সদাই পাতির দরকার ছিল ।
দাদা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বললেন " কলা বেচপার কও। আমার নাতীরা খাবে না?"
আম্মা তাড়াতাড়ি বললেন, " খাবে না কেন? একসাথে দুই ছড়ি পাকছে তো।গাছে আরো কলা
আছে।
অনিচ্ছা সত্তে ও দাদা রাজি হলেন। ছোট ভাই মিজানকে নিয়ে বাজারে গেলেন কলা ছড়ি নিয়ে ।
কলা নিয়ে হাটের নির্দিষ্ট জায়গায় বসতেই এক লোক আসলো কলা কিনতে । দাদার দিকে তাকিয়ে
বিদ্রুপের হাসি হেসে বললো " কি চাচা শেষ পর্যন্ত কলা বেচতে আসছেন? দাদা চুপ করে
থাকলেন, লোকটি সাথে নিয়ে আসা কাজের ছেলেকে বলল " এই ছোড়া এই কলার ছড়ি নিয়ে বাসায়
রেখে আয়"।
ছেলেটি কলা নিয়ে চলে গেল। লোকটাও অন্য দিকে চলে যাচ্ছিল, দাদা যেয়ে সামনে দাড়ালেন।
বললেন " কলার দাম দিলেন না?" লোকটা যেন অবাক হলো। বলল " কলার দাম? চাচা
আপনার সাহস দেখে অবাক হই। প্রকাশ্যে হাটে এসেছেন। তা আবার সামনেই থানা"।
দাদা বললেন "তার মানে? আমি কলা চুরি করে এনেছি নাকি?" লোকটা বলল "চাচা
আপনি তো চোর ডাকাতের চেয়ে ও ভয়ংকর। দুস্কিৃতিকারীর বাবা। আপনার ছেলে এখন কোথায় বলেন
তো? দেশকে ধ্বংস করার কাজে লিপ্ত।
এক্ষুনি কথাটা যদি আমি থানায় বলি তো আপনার উপায় আছে?"
আমার অসহায় দাদা ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে বাড়ি চলে আসেন। দাদা আমাদের কিছুই বললেন না।
মিজানের কাছেই সব শুনলাম। আমার মা খুব কষ্ট পেলেন। বার বার বলতে লাগলেন " আমার
দোষ, আমার দোষেই এমনটা হলো। কেন আমি জোর করে পাঠালাম" । মা দাদা কাছে যেয়ে কাঁদতে
কাঁদতে মাফ চাইলেন। আমার দাদীও কাঁদতে লাগলেন। দাদা ব্যথিত স্বরে বললেন " না মা
তোমার আর দোষ কি? দোষ আমাদের কপালের।" নভেম্বরের শেষ দিকের ঘটনা।
সপ্তাহ খানিক পরে আব্বা বাড়ি আসলেন। সব শুনলেন বললেন " খুব তাড়াতাড়ি দেশ স্বাধীন
হয়ে যাচ্ছে। যে যা করার করুক, যে যা বলার বলুক। তোমরা ধৈর্য্য ধরে থাক, মন খারাপ করো
না।"
সামনা সামনি যুদ্ধ:- আব্বা এবার অসুস্থ্য হয়ে বাড়ি এসেছেন। চোখ দুটো জবা
ফুলের মতো লাল টকটকে। মাথা ব্যাথা,জ্বর । সারাদিন রাত বাড়িতে থাকেন। বাড়ি থেকে বের
হন না। সেদিন ছিল ১৪ই ডিস্মেবর, সকাল ৯/১০ টা হবে। উঠানে পাটি বিছিয়ে রোদে বসে মুড়ি
খাচ্ছি আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনছি। এমন সময় মুক্তিযোদ্ধা হান্নান কাকা কোত্থেকে
যেনো দৌড়ে আমাদের বাড়ির সামনে এসে আমার আব্বাকে চিৎকার করে বলতে লাগলেন " দাদা
আর্মী- দাদা আর্মী -- বলতে বলতে দৌড়ে চলে গেলেন বাড়ির উত্তর দিকে। আব্বা মূহুর্তের
মধ্যে তার এস.এল.আর টা নিয়ে উত্তর দিকে পাকা রাস্তার দিকে ছুটলেন। আমরা তিন/চার জন
ছোটরাও দৌড়ে বের হয়েছিলাম আব্বার পিছনে পিছনে কিন্তু মা, দাদী, ফুপুরা পুকুর পাড়ে যেতেই
আমাদের আটকে দিলেন। আমরা পুকুরের এ পাড়ে দাড়িয়ে থাকলাম। আব্বা পুকুরের পশ্চিম পাড় দিয়ে
বড়রাস্তার কাছাকাছি যেয়ে থমকে দাড়ালেন।
মুক্তিবাহিনীর সাথে আর্মির যুদ্ধ হয়েছে আমগ্রাম ব্রীজের কাছে। ঐখানে আর্মী ক্যাম্প
ছিল। সেখানে কিছু আর্মী নিহত হয়েছে কিছু বন্দী হয়েছে। আর এই একজন কি ভাবে যেন পালিয়ে
এসেছে। পালায়ে সে টেকেরহাট যাওয়ার চেষ্টা করছিল। টেকের হাটে আর্মী এবং রাজাকারদের বড়
ঘাটিঁ। তার হয়তো ধারনা ছিল টেকের হাট পৌছাতে পারলেই সে বেঁচে যাবে। সে টেকের হাটের
দিকে প্রায় ৬/৭ মাইল রাস্তা পার হয়ে এসেছে। আর দুই তিন মাইল দুই তিন মাইল যেতে
পারলেই টেকের হাট পৌঁছে যেত। কিন্তু পৌঁছাতে পারলেও লাভ হতো না। গতকাল মুক্তিযোদ্ধাদের
হতে টেকেরহাটের পতন হয়েছে। যা হোক এত দূর সবার চোখকে ফাকিঁ দিয়ে কিভাবে আসলো এটাই আশ্চর্যের
ব্যাপার। চলবে----
আমার আব্বা ও কাছাকাছি পৌছে জোরে জোরে উর্দূতে বললেন "তুমি সারেন্ডার করো তোমাকে
বাঁচায়ে দিব।"
"তোম সারেন্ডার করো--- ।" বলে ও সাথে সাথে গুলি করলো আব্বাকে । আব্বা
সাথে সাথে পড়ে গেলেন। মনে হলো গুলি লেগেই পড়ে গেছেন। আমার দাদী চিৎকার করতে করতে যেয়ে
আব্বাকে ধরলেন। আমরা ছোটরাও পৌছে গেছি আব্বার কাছে। আব্বা বললেন " আহা
তোমরা আসছো কেন, শুয়ে পড়, শুয়ে পড় ।" পাকা রাস্তার উপর তখন মেশিনগানের ঠা ঠা শব্দ।
একটু পরেই গুলির শব্দ বন্ধ হয়ে জয়বাংলা শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল যেন আকাশ বাতাস। লোকে
লোকারন্য হয়ে গেল এলাকা। আব্বাকে পড়ে যেতে দেখে সাথে সাথে মেশিনগানের গুলি করেছিল হান্নান
চাচা। হান্নান চাচা বললেন " দাদা আপনি ওকে বাঁচাতে চাচ্ছিলেন কেন ? আর একটু হলে
কি সর্বনাশ হয়ে যেত বলেন দেখি।"
আব্বা বললেন " ঠিক বলেছ আমি ওকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম কিন্তু মৃত্যু ওর ঘাড়ে বসে
আছে আমি কি ভাবে ওকে বাঁচাবো?" আব্বার হাত ধরে বাড়ি চলে আসলাম। সে জায়গা দিয়ে
যে জায়গায় আব্বা শুয়ে পড়েছিলেন, তারপর থেকে যখনই ঐ জায়গা দিয়ে যাতায়াত করতাম তখনই আব্বার
পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা মনে পড়ত। এখন ও মনে পড়ে। একটু ও ম্লান হয়নি সে দৃশ্য।
তারপরের দৃশ্যটা বিভৎস। নিহত আর্মীর ছোট্ট একটা প্যাট ছাড়া সমস্ত কাপড় চোপড় টেনে ছিড়ে
খুলে ফেলল বাঙালিরা। তারপর পায়ে দড়ি বেধে জমির আইলের উপর দিয়ে কুকুর শিয়ালের মতো টেনে
হিচরে খাল পাড়ে নিয়ে চাপা মাটি দিয়ে রেখে দিল।
আবুল হোসেন কাকা আমার মা কে ডেকে বলল " জানেন ভাবী মানত করেছিলাম যে একটা
মরা আর্মী পাইলে তিনটা লাথি মারব। তা আল্লাহ আইজ সুযোগ দিল আমি আমার মানতটা পুরা করলাম।"
সত্তার মোল্লা গ্রেফতার :- দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে । মুক্তি যোদ্ধারা গ্রামে
গ্রামে ঘুরে ঘুরে রাজাকারদের গ্রেফতার করছে। অত্যাচার করছে। ব্যক্তি শত্রুতা উদ্ধার
করছে। এমনি সময় এক রাতে সত্তার মোল্লা আমাদের বাড়িতে এসে হাজির।
রাত প্রায় ১০টা বাজে। আমরা কেউ ঘুমাইনি। সত্তার মোল্লা ঘরে ঢুকেই এক হাত দিয়ে
আমার দাদীর পা আর একহাত দিয়ে দাদা পা চেপে ধরল। " চাচী আমারে মাফ করে দাও, দুদু
আমারে মাফ করে দাও।"
সত্তার মোল্লার দাদা আর আমার দাদার বাবা এরা দুইজন চাচাতো ভাই। তার মানে
আমার দাদা সত্তার মোল্লার চাচা হয়। চাচাকে এই এলাকায় দুদু বলে ডাকে। অনেক আগে থেকেই
সত্তার মোল্লা আমার দাদা দাদীর সাথে দুর্ব্যবহার করত। এজমালী পুকুর , জমি, গাছ
কোন কিছুর ভাগ ই সে আমাদের দিত না।
সত্তার মোল্লার অনেক জনবল, পাঁচ/ছয় টা ভাই তারা।তাদের ছেলেও অনেক। এদিকে আমার দাদার
কোন ভাই নাই, আমার আব্বার ও কোন ভাই নাই। এই জন্য সত্তার মোল্লার কাছে আমার দাদা সবসময়ই
নির্যাতিত হয়ে এসেছেন।
তবে যুদ্ধের সময় সত্তর মোল্লা তেমন কোনো নির্যাতন কিংবা দুর্ব্যবহার করেছে বলে মনে
পড়ে না। যা হোক সত্তার মোল্লা অনুরোধ করতে লাগলো তাকে আজ রাতে ঘরে থাকতে দেওয়ার জন্য
। মুক্তিযোদ্ধারা নাকি তাকে খোঁজাখুজিঁ করছে। কাল সকালেই সে দূরে কোথাও চলে যাবে। মুক্তিযোদ্ধারা
নাকি কয়েক বার তার বাড়িতে গেছে।
আমরা যে ঘরে ঘুমাই সেই ঘরেই সত্তার মোল্লাকে ঘুমাতে দেওয়া হলো। সে কিছুতেই ড্রইং
রুমে থাকবে না। অগত্যা তাকে আমাদের বেড রুমেই থাকতে দিলেন আব্বা। এদিকে রাত তিনটার
দিকে মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাসা্য় হাজির। হিন্দু মুসলমান মিলে ১০/১২ জন।
" শীতে জমে গেলাম দাদা" বলে একজন খাটের নিচ থেকে আগুনের পাত্রটা বের নিল।
আর একজন বলল " চাচী এই যে আমাদের জন্য আগুনের ব্যবস্থা করে রাখে এর
জন্যই চাচী বেহেসতে চলে যাবেন"। আর কয়েকজন সায় দিয়ে বলল " তা ঠিক তা ঠিক"।
ওদের কলকালিতে আমাদের সবার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমাদের সবাই কে আগেই নিষেধ করা হয়েছে যে
সত্তার মোল্লা আমাদের ঘরে আছে এ কথা যেন আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বলে না দেই।
একজন বলল " দাদা আমাদের অপারেশনটা একেবারে বিফলে গেলো। আমাদের কাছে জেনুইন খবর
আছে শালা আইজ এই গ্রামেই আছে। কিন্তু গেল কই। ওর বাড়ি , ঘর , খাটের তলা , ল্যাট্রিন,
খড়ের মাচা কিছুই বাদ দেইনি।" আর একজন বলল " ওর বাড়িতে আর পুকুর পাড়ে
যতো গাছ আছে প্রত্যেকটা গাছে গাছে টর্চ মেরে দেখেছি। শালা পলাইল কোথায়?" আব্বা
বললেন " এখন খাওয়া দাওয়া করে ঘুমা তো। যাবে কোথায়? দেখা যাবে কাল।" আব্বার
কথা শেষ না হতেই সত্তার মোল্লা খক খক করে কাশি দিয়ে উঠল। চমকে উঠল মুক্তিযোদ্ধা কাকারা।
"দাদা আপনার ঘরের মধে কে কাশি দিল? আব্বা কি আর বলবেন? চুপ করে থাকলেন। মুক্তিযোদ্ধা
কাকারা একটু চুপ করে থেকে হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর হান্নান কাকা বললেন, "দাদা
শেষ পর্যন্ত শালা সিংহের গুহায় আইসা পলাইছে? ওরে এখখনি ধরবো।"
আব্বা দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে দরজায় দাড়ালেন, বললেন " না একাজ আমি তোমাদের
করতে দেব না। সে আমার কাছে আশ্রয় নিয়েছে। মুসলমান চরম শত্রুকেও যদি আশ্রয় দেয়
, জীবন থাকতে তার কোন ক্ষতি হতে দেয় না।"
মুক্তিযোদ্ধা কাকুরা আমার আব্বার মুখের দিকে তাকায়ে থাকলেন। আব্বা আবার বললেন
" আমার কথা শোনো, আজকে রাতে তাকে ধরো না। কাল সকালে সে আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে
যাবে তখন ধইরো, আর সামান্য রাত বাকি আছে, তোমরা একটু ঘুমাও। বুঝলাইতো সে এখন
তোমাদের হাতের নাগালে তাইলে অত তাড়াহুড়ার দরকার কি?"
আমার কাছে খুবই মজা লাগছিল একটা টিনের বেড়ার এপারে মুক্তিযোদ্ধারা আর ওপারে রাজাকারের
কমান্ডার সত্তার রাজাকার। উভয় উভয়ের উপস্থিতি জানে।------------ চলবে-------





Comments
Post a Comment