on
সূরা আর-রাদ
- Get link
- X
- Other Apps
শ্রেণিকক্ষে ফিরুক শিক্ষকদের মেধা ও দায়বদ্ধতা
বাংলাদেশ শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্তমান কারিকুলামে শিখনকে আনন্দদায়ক, সর্বাত্মক বোধগম্য এবং উপভোগ্য করে তুলতে সরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। শিক্ষকদের জন্য সরকারি খরচে দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী আইসিটি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে তারা কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও প্রজেক্টরের মাধ্যমে আকর্ষণীয় প্রেজেন্টেশনের সাহায্যে ইন্টারঅ্যাকটিভ বা মতবিনিময়মূলক ক্লাস পরিচালনা করতে পারেন। দেশের অধিকাংশ স্কুল-কলেজে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে আধুনিক আইসিটি ল্যাব।
কিন্তু অত্যন্ত হতাশার বিষয় হলো, এই বিশাল সুযোগ থাকার পরও একশ্রেণির শিক্ষকের ক্লাসে পাঠদানের চরম অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি সুযোগ-সুবিধার সদ্ব্যবহার না করে তারা সনাতন পদ্ধতিতে নিজের বাড়িতে কিংবা বাসা ভাড়া নিয়ে ব্যাচের পর ব্যাচ প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্যে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
বদলগাছীর বাস্তবচিত্র: ক্লাসরুম হইচই, প্রাইভেট সেন্টার জমজমাট
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা না দিয়ে নানা উপায়ে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে জানা যায়, বিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকই এই কোচিং নির্ভরতার সাথে যুক্ত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রধান শিক্ষক জানান, নানা অজুহাতে শিক্ষকরা ক্লাসে অনিহা প্রকাশ করেন।
বর্তমানে শিক্ষকদের মূল কাজ যেন কেবল স্কুলে গিয়ে হাজিরা দেওয়া, ছাত্র-ছাত্রীদের হাজিরা নেওয়া এবং পরীক্ষা আয়োজন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
কোচিংয়ে ভিড় বাড়াতে ক্লাসে অসারতা: স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি তলানিতে ঠেকলেও শিক্ষকদের বাসা বা কোচিং সেন্টারে ভিড় উপচে পড়ে। উপজেলাজুড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে শুরু করে হাই স্কুল ও কলেজ এমনকি মাদ্রাসার শিক্ষকরাও বাসায় ৪ থেকে ৫টি ব্যাচে ২০-২৫ জন করে শিক্ষার্থী পড়িয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
গ্রাম থেকে শহরে কোচিং বাণিজ্য:
অনেক শিক্ষক গ্রাম্য এলাকা থেকে উপজেলা শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে এই প্রাইভেট বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। স্কুল সময়ে দায়সারা উপস্থিতির পর রাত ১০-১১টা পর্যন্ত কোচিং ব্যবসা পরিচালনা করাই তাদের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রাইভেট কোচিংয়ের আড়ালে বিপদের মুখে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা
স্কুলের পড়াশোনা বাদ দিয়ে কোচিং ও প্রাইভেট নির্ভরতার কারণে কেবল মেধার অপমৃত্যু ঘটছে তা নয়, এর সাথে জড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ সামাজিক অপরাধ। প্রাইভেট কোচিং এবং ব্যাচভিত্তিক পড়াশোনার নামে
শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপকর্মে-
কিশোর গ্যাং ও বিপথগামী কালচার: অসচেতন পরিবেশে কিশোর গ্যাং কালচার এবং বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড সংস্কৃতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
মাদকাসক্তি: অভিভাবকদের নজরদারির বাইরে থেকে উঠতি বয়সী শিক্ষার্থীরা সিগারেট, গাঁজা, ফেনসিডিল ও ইয়াবার মতো সর্বনাশা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
শিক্ষক রাজনীতি বনাম শিক্ষাদান
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, স্কুল চলাকালীন সময়ে অনেক শিক্ষক ক্লাসে মন না দিয়ে স্থানীয় রাজনীতি কিংবা শিক্ষক রাজনীতির চর্চায় ব্যস্ত থাকেন। যাদের হাতে জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব, তারা যদি রাজনৈতিক গ্যাড়াকলে এবং ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থে মেধা ব্যয় করেন, তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবে? যেসব শিক্ষার্থীর প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য নেই, তারা পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করে শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে।
সময় এসেছে বদল আনার-
কোনো অজুহাত নয়, চাই ক্লাসে শতভাগ আন্তরিকতা
সরকার আইসিটি ল্যাব ও প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষকদের কাজের পথ সুগম করে দিলেও সদিচ্ছার অভাবে তা ভেস্তে যেতে বসেছে। এখন সময় এসেছে সব ধরনের অজুহাত বাদ দিয়ে শিক্ষকদের মূল কর্মক্ষেত্র শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার।
"প্রাইভেট কোচিংয়ের অন্ধকার ঘর থেকে শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে হবে আইসিটি সম্বলিত আলোকিত ক্লাসরুমে। শিক্ষকদের মেধার সঠিক ব্যবহার হোক কেবল স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে, কোনো ব্যক্তিগত কোচিংয়ে নয়।"
এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে এই কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে এবং স্কুল সময়ের ক্লাসে শিক্ষকদের শতভাগ উপস্থিতি ও মেধা নিশ্চিত করতে শিক্ষা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আসুন, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে ক্লাসরুমের শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করি এবং কোচিং নির্ভরতার অভিশাপ
থেকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে মুক্ত করি।
Comments
Post a Comment